Doodles

নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে ছাত্রদের অ্যালার্ম ঘড়ি রাখতে দেওয়া হতো  না | তার পরিবর্তে প্রতিটি বিশেষ মুহূর্তের জানান দিতে ও সময়ের হিসেব ঠিক রাখতে দেওয়ালে থাকত বড় ঘড়ি আর সময়মতো ঘন্টা বাজানো |




_________________________________________________________
_________________________________________________________



রোজকার খেলা নিয়মিত হয়তো দেখার সুযোগ হয়ে উঠত না , তবে বিশেষ খেলা , যেমন ইন্ডিয়ার কোনো ফাইনাল খেলা, বা ওয়ার্ল্ড কাপ, সে ফুটবল হোক বা ক্রিকেট দেখার সুযোগ অবশ্যই করে দেওয়া হতো | বিরাট পর্দায় প্রজেক্টরের আলো ফেলে সেই উপভোগ্য ম্যাচ দর্শন | নিজের প্রিয় টিম ম্যাচ জিতলে নরেন্দ্রপুরের বাইরে ফাটত আতসবাজি , আর ভেতরে ছাত্ররা একসাথে গোল করে ঘুরে ঘুরে করতাম উদ্দাম নৃত্য | নরেন্দ্রপুরিও ভাষায় এর অবশ্য একটা বিশেষ নাম আছে - "সাম্বা" |




_________________________________________________________
_________________________________________________________



শনিবার  বলতে আমাদের কারোর কারোর কথায় সেটা হলো "সোনামণি বার", এখানে "আমাদের" বলতে নরেন্দ্রপুরের ছাত্র, কারণ আমরা কখনও "আমি"-তে অভ্যস্ত নই | বিশেষ পছন্দের দিন কারণ হাফ-ডে স্কুল , দুপুরে ভাতঘুম, পরেরদিনের একটা ছুটি হাতে রেখে খেলতে যাওয়া , বিকেলে হালকা খাবারে ফুচকা, সন্ধ্যেবেলা কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান না থাকলে অ্যাসেম্বলি হলে সবাই মিলে একসাথে সিনেমা দেখা এবং সর্বোপরি রাতে মাংস-ভাত | একদিনে এর বেশি আর কি চাইতে পারে একজন স্কুলে পড়াশোনা করা ছাত্র !!




_________________________________________________________
_________________________________________________________



রোববার মানেই সানডে সাসপেন্স | তবে এ বদভ্যেসটা শুরু হয়েছে মোটামুটি ক্লাস এইটের দিক থেকে | ভবনের স্যাররা নিজেদের কাছে রেডিও রাখতেন | আমরা তাই স্যারেদের কাছে গিয়ে সানডে সাসপেন্স শুনতে বসতাম প্রতি রোববার দুপুর বারোটায় | কোনদিন মিস করে ফেললে পরের শনিবার বিকেল চারটেই | যত বড় হয়ে উঠলাম অভ্যেস খানিকটা পাল্টে যেতে লাগলো | ক্লাস ইলেভেন-টুএলভে উঠে স্যারেদের ভরসা ছেড়ে নিজেরাই রেডিও নিয়ে এসে হাজির | রাখার নিয়ম ছিল না , তাই নিয়ম ভাঙ্গার আলাদা আনন্দ ছিল | জানতে পারলে কয়েকদিনের জন্য সাসপেন্ড হতে হবে জেনেও সে ভয় মাথায় নিয়ে অবাধে ঘুরতাম | তখন আর দুপুরে নয় , শোনা শুরু হলো রাতের অন্ধকারে ১১টার সময় থেকে | একটামাত্র রেডিও , কয়েক জোড়া কান , জমাট বাঁধা অন্ধকার | 




_________________________________________________________
_________________________________________________________



তিনি নন অতি অতি-সাধারণ
খেলাধূলা নাই যা না জানেন 
মুগ ডালেতে যে মজে থাকে মন 
নেশা শুধু "বিড়ি"টাই মানেন 
কবিতা আবৃত্তি ভালো করেন | খেলার মাঠে ক্রিকেট, ফুটবল, টেবিল টেনিস, ভলিবল কি নেই যা তিনি জানেন না !! তাই ছাত্রদের শুধু বিভিন্ন খেলার অ-আ-ক-খ-ই শেখান না , সাথে সাথে ক্রিকেটে অলরাউন্ডার হতে গেলে কিভাবে বোলিং করতে হবে, কিভাবে ব্যাটিং আর কিভাবেই বা ফিল্ডিং করে ম্যাচ জেতানোর উপযুক্ত হয়ে উঠতে হবে তার ব্যাকরণও তিনি অক্ষরে অক্ষরে শিখিয়ে দেন | কোনো খাওয়ার নেমন্তন্ন পেলে মাঝে মাঝেই বলে উঠতেন মেনু তে কি আছে ?? মেনু যাইহোক না কেন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠতেন , আমার তো এক বাটি সরু চালের ভাত,রুই মাছের মাথা দিয়ে এক বাটি সোনা মুগের ডাল, ঠিক দুটি পোস্তের বড়া , পাতলা করে ইলিশ মাছের ঝোল , ঠিক দুটি সন্দেশ হলেই "হেঁয়াওওওও" বলে একটা ঢেকুর তুলে ফেলতেন প্রায় | অবশ্য আমাদের শয়তানিতে ওই মেনুতে শেষে একটি "বিড়ি"ও যুক্ত হয়েছে কারণ উনার কাছে বিড়ি হলো অক্সিজেনের চেয়েও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় !! তাঁর একটা স্কুটি ছিল যেটার প্রায় জীর্ণপ্রায় দশা কিন্তু সবসময়ের সঙ্গী , সেটার একটা নাম দিয়েছিলাম আমরা "ধুম সাড়ে তিন" |




_________________________________________________________
_________________________________________________________



ক্লাস ওয়ায়িজ কম্পিটিশনে এক ক্লাস ছিল অন্য ক্লাসের রাইভাল | যেমন এইট-নাইন-টেন-ইলেভেন-টুএলভ , এরা একজন আর একজনের জেতা পছন্দ করত না | তবে সবচেয়ে বেশি রেষারেষিটা থাকত নিজের সবচেয়ে কাছের ওপরের বা নিচের ব্যাচের সাথে | যেমন , ক্লাস নাইনের সাথে ক্লাস এইট আর ক্লাস টেনের সাংঘাতিক সাপে-নেউলে সম্পর্ক , কিন্তু ক্লাস টেন-এইট জোট ছিল দাদা-ভাই সম্পর্কে বাঁধা | আর প্রধান বিশ্বযুদ্ধ গুলোর মধ্যে ছিল ফুটবল ম্যাচ, ক্যুইজ কম্পিটিশন এবং স্পোর্টসের সর্বশেষ ইভেন্ট রিলে রেস |




_________________________________________________________
_________________________________________________________



স্কুলের বাচ্চাদের জীবনে খেলাধূলার সময় এবং সুযোগ কতটা আছে জানি না , কিন্তু সেই স্কুল যদি নরেন্দ্রপুর হয় তবে হলফ করে বলতে পারি , এই স্বাদটুকুর একটুও সে মিস করবে না | মিশনটা অনেকগুলো ভাগে বিভক্ত , তার মধ্যে স্কুলের যে প্রধান অংশ দুটো তা হলো জুনিয়র সেকশন আর সিনিয়র সেকশন | জুনিয়র সেকশনে থাকত ক্লাস ৫,৬,৭-এর ছাত্ররা , সেখানে কোনো দোষ করলে প্রধান শাস্তি ছিল খেলা বন্ধ করে দেওয়া , আর সিনিয়র সেকশনে বাকি ছাত্ররা , সেখানে পড়াশোনার চাপ একটু বাড়তো বলে অনেকে খেলতে যেতে চাইত না , কিন্তু খেলতে যাওয়াটা আবশ্যক স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য | তাই সেখানে খেলার মাঠে অ্যাটেনডেন্স নেওয়া হতো , যাতে সবাই খেলতে আসে | 




_________________________________________________________
_________________________________________________________



নরেন্দ্রপুর হলো শুধুমাত্র ছাত্রাবাস অর্থাৎ সেখানে কেবলমাত্র ছাত্ররাই পড়াশোনা করতে যায় | এমনকি কোনো শিক্ষিকাও সেখানে আজ পর্যন্ত চোখে পড়েনি | সেখানে নারী জাতি বলতে একমাত্র অমানবীয় অবয়বই চোখে পড়বে |




_________________________________________________________
_________________________________________________________



ছোটবেলায় হোস্টেলে গেলে হনুমান টুপি পড়তে দেখলে একজন আর একজনকে রাগায় , তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই সবাই মা-কে বলতাম আমার মাফলার চাই | এইসব টুপি আমি পড়ব না | বয়স বাড়তেই বুঝলাম হনুমান টুপির উপকারিতা থুড়ি কার্যকারিতা | যখন ক্লাস ইলেভেনে রেডিও-হেডফোন এলো , তখন মাফলারের চেয়ে হনুমান টুপিই ছিল সবাইকে টুপি পড়িয়ে চোখে ধুলো দিয়ে সবার সামনে দিয়ে নিশ্চিন্তে বেরিয়ে যাওয়া |




_________________________________________________________
_________________________________________________________





No comments:

Post a Comment

পেটে আসছে মুখে আসছে না ? লিখুন , লিখুন !!