Sunday, October 11, 2015

পূজোর গন্ধ

_________________________________________________

পুজো এলেই রুটিন মান্যতায় হঠাৎ জোয়ার আসে। যাবতীয় অনীহা উপস্থিতির আনন্দে ভাসে। আর সাড়ে এগারোটা স্টাডি হল, আটবেলা প্রেয়ার,ঊনিশ বেলা ডাইনিং হল যাত্রা। শূন্যপথের দিকে এই হিসেবী পিছিয়ে চলায় খেলা বাদ দিয়ে নিস্তার পায় না কেউই। 'পুজো আসছে'- এ অনুভূতির ধুনো-ধোঁয়ায় যতটা ভালো লাগে,'পুজো আসছে,বাড়ি যাব'- এমনতর ভাবাকুলতা আদতে পুজো আসাকে তিলে তিলে বাঙ্ময় করে তোলে।
রুমে রুমে সম্মিলিত দিনগোনায় পাতাভরা অছিলা...
রিভিশন টেস্ট,প্রি টেস্ট মুখে নিঝুম সেল্ফ স্টাডিতে রেডিও-র লাইসেন্সপ্রাপ্তি ঘটানোর লাইন! কাল যে মহালয়া- কাল থেকে যে ধৈর্যের বাঁধ নতুন করে ভাঙবে। এ তাড়না "রূপং দেহি,জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি" শোনার নয়। মহালয়া তো একটা উপলক্ষ্য মাত্র । আসলে মহালয়ার ৩টে ৪৫-এ জেগে ওঠাতেই আমরা পুঁতে দিতাম সপ্তমীর নাগলিঙ্গমের চারা। কাল মহালয়া- "আজ আগমনীর আবাহনে কী সুর উঠেছে বেজে" । "অয়ি গিরিনন্দিনী নন্দিতমেদিনি বিশ্ববিনোদিনি নন্দনুতে"-র সময় বেশীরভাগেরই চোখে ঘুম নেই।

ডি ডি বাংলার মহিষাসুরমর্দিনীর সে কী মায়া...
ধ্যানস্থ মোষাসুর মাঝে মাঝেই বলবে- "ওঁ ব্রহ্মণে নমঃ", ঊর্বশী দেবে উঁকি,চণ্ডঘটা দেবী হু-হুংকারে ছুঁড়ে দেবে আগুন । অপরিবর্তিত চিরকালীন পুরাণকাহিনীতেও আমরা খুঁজতাম কোথায় কোথায় নতুন করে নতুন কিছু পাব বলে । white horse এর সাদা ঘোড়া আমাদের সাদা ধুতি থেকে গত বছরের খুকুমণি আলতা-সিঁদুরের দাগ তুলতে পারবে ??

শেষপাতে মন ভালো করা- "এই শরত-তপনে প্রাণের স্বপনে চিরসাথী শালিমার...."
পঞ্চমীতে পরীক্ষা শেষ করে গাড়ি,অটো,ট্যাক্সিতে বাড়ি ফেরার সময় হাসিমুখে বাহাদুরদার বাড়ানো হাতে পৃথিবী পাল্টানোর সুনিশ্চিত ভাগ্যরেখা আঁকা থাকত। কোথায় কতবড় দুর্গা তৈরী হচ্ছে, কোথায় বা বাঁশের পেরেকে মরচে- একটা বিরাট গেটের এপার থেকে যখন ওপারের ছিটেফোঁটাও আঁচ করা যায় না,মনে মনে অনিশ্চয়তা তৈরী হয় হঠাৎ।
সব প্যান্ডেল শেষ হয়েছে তো ??

গত বুধবারের বৃষ্টিতে সিদ্ধিদাত্রী দেবীর সব তিনচোখ ধুয়ে যায়নি তো?
ট্যাক্সি গেট পেরোতেই জানতে পারা-না,কোনো অঘটন ঘটেনি।
পঞ্চমীর গোধূলি তারস্বরে বলতে থাকে- 'তুই ছিলি না বলে আমরা থেমে থাকব কেন? ছুটি তো সবে শুরু তোর। পি.ভি.টি নিয়ে কথা হবে লক্ষ্মীপুজোর পরে....'
আলোয় আলোয় উপোসি শরীর-মনের ঘুপচি অন্ধকার ঘুচে যায় ।
অনিয়মের পুজো আমাদের ঘরে ততক্ষণ আসত না যতক্ষণ না মালবোঝাই আমরা ঐ বিশাল গেট থেকে ঘরের ছোট দরজার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছি।

পুজোর আগে পরীক্ষা তখনও ছিল,এখনও আছে।
নতুন জামা তখনও ছিল,এখনও আছে।
কবে কোথায় চষে বেড়াব তা ছকে নেওয়ার সান্ধ্যবাসর তখনও ছিল,এখনও আছে।

শুধু নেই গেট পার হবার আগের মুহূর্ত অবধি সত্যিই সবকিছু প্রতিবারের মতো নিয়মমেনে হচ্ছে কিনা তা অজানা থাকার ধুকপুকানিটা...
রহস্য আর ঘন থাকে না।
জীবনের পুজোয় যে রহস্যমঙ্গলঘটের ভাসান হয়ে গেছে,জল তোলপাড় করে তার কাঠামো মিলবে বারবার..প্রতিমা আর তৈরী হবে না ।।
_________________________________________________
শৌণক [ মাধ্যমিক ২০১০,উচ্চ মাধ্যমিক ২০১২]

Tuesday, October 6, 2015

চিঠি-কান্ড

চিঠি-কান্ড

সরকারী চাকুরি, পদবীও তাই 
ছেলে তার বড় ভালো, কোনো জ্বালা নাই 
পড়াশোনা করে ভালো, বেয়াদবি নেই
ভর্তি হয়েছে সে নরেন্দ্রপুরেতেই 
মাসে মাসে দুটো দিনে, দেখার সময় 
তাতেও মায়ের মনে দ্বিধা রয়ে যায় 
ছেলে যেন পড়াশোনা করে ঠিকমতো
চিন্তায় কাটে দিন এখনো সে ছোট
হপ্তায় খান দুই চিঠি দেওয়া চাই
একখান বাবাকে, একখান মা'য় 
চলছিল বেশ ভালো আনন্দে থাকা 
শয়তানি বুদ্ধিতে মাথা তার ঢাকা 
ভিসিটিং-এ একদিন খেল বেশ বকা 
দুষ্টুমি কী এক করেছে যে খোকা 
সোমবারে বসে বসে লিখল সে পত্র
হাসপাতালেতে সে গেড়েছে যে ছত্র 
বাড়ি বয়ে এলো চিঠি শুক্কুরবারে 
বাবার কপালে চোখ চিঠিখানা পড়ে 
ভবনের মহারাজে করলেন ফোন
জিঘালেন ছেলে তার আছে সে কেমন 
মহারাজ অবাক হয়ে - "কিছু হয়নি তো তার ?"
দিব্যি আছে সে ছেলে হুল্লোড়ে মাতোয়ার 
মনে মনে বেশ রেগে ফোন রাখলেন
"ঠিক আছে তো ছেলে আমার?",মা যে শুধোলেন 
বললেন বাবা - ছেলে হয়েছে কি গুণী !
কি লিখেছে চিঠিতে সে তাই আগে শুনি
ছেলে তার শিখেছে যে শয়তানি কথা 
লিখেছিল চিঠিতে কিডনিতে ব্যথা |
_________________________________________________ 

Thursday, August 27, 2015

ম্যাগনেটিজম

__________________________________________________

- কি হে অজিত, কেমন আছ ?

-- আরে তুমি !! কখন এলে ?

- আর বোলো না , পা ভেঙ্গে পরেছিলাম | ব্যথা সইছিল না | তাই আর কি ! তা কি পড়াচ্ছ ছেলেদের ?

-- ম্যাগনেটিজম !!

- ম্যাগনেটিজম !! তাহলে বোর্ডে ওসব টেস্টিস এঁকে কী ছাই-পাশ বোঝাচ্ছ ?

-- রি-প্রোডাকশন |

- ধুর অজিত, তুমি তো লাইফ সাইন্স আর ফিসিক্স এক করে ফেললে দেখছি | কি ছাতার মাথা পড়াচ্ছ |

-- আমি জানতাম বুঝবে না |

- কি বুঝব না ?

-- দেখো, বুঝিয়ে বলি , এই যে রি-প্রোডাকশন | এটার জন্য স্ত্রী-পুরুষের যে সঙ্গম দরকার সেটাও তো একটা ম্যাগনেটিজম | এই যে ছোকরা হাসছ কেন কেউ হাসবে না | আমাদের সবার মধ্যেই কম বেশি ম্যাগনেটিজম রয়েছে |

- সেটা কেমন ?

-- এই যেমন ধর , বাঙালির চিংড়ির প্রতি | বাঙালের ইলিশের প্রতি | প্রেমিকের প্রেমিকার প্রতি | পিপঁড়ের মিষ্টির প্রতি | মেয়েদের ফুচকার প্রতি | শুধু এক-একটা রূপ | কিন্তু ডেফিনেশন একই |

- দারুণ বললে তো | বুঝেছি বুঝেছি | ওপরে এসেও থামনি দেখছি | এখানেও টোল খুলে বসেছ |

-- কর্তব্য পালনে ত্রুটি কেন রাখব ? নিচে আমার ছাত্ররা পড়াবে , আর ওপরে আমি | তা তোমার ক্ষেত্রে ম্যাগনেটিজমটা কী শুনি ?

- কেন , গ্রীষ্মকালে ধুতির নিচে ভেজা গামছা !!


-- সাবাস মুকুন্দ !!

__________________________________________________

Thursday, August 20, 2015

বাংলা সিলেবাস

- এইটা আমার ক্লাস তো ?

-- হ্যাঁ , স্যার !

- আচ্ছা, কেউ একজন বলো তো , এ মাসের বাংলা সিলেবাসে কবিতা কী কী আছে ?

-- স্যার , ফ্যান আর দুরন্ত আশা !!

- ফ্যান !!! অত্যন্ত জঘন্য কবিতা | কেন যে সিলেবাসে এইসব আজে বাজে কবিতা দেয়  বুঝে পাই না আমি | লোহার ব্যথা , উলঙ্গ রাজা এত ভালো ভালো কবিতা থাকতে এইসব পড়িয়ে সময় নষ্ট | যাইহোক , কেউ একজন পড় |

-- ফ্যান
নগরের পথে পথে দেখেছ অদ্ভুত এক জীব
ঠিক মানুষের মতো
কিংবা ঠিক নয়,
যেন তার ব্যঙ্গ-চিত্র বিদ্রূপ-বিকৃত !
তবু তারা নড়ে চড়ে কথা বলে, আর
জঞ্জালের মত জমে রাস্তায়-রাস্তায়।
উচ্ছিষ্টের আস্তাকূড়ে ব'সে ব'সে ধোঁকে
আর ফ্যান চায়।

- এই থামো ,
নগরের পথে পথে দেখেছ অদ্ভুত এক জীব
ঠিক মানুষের মতো
কিংবা ঠিক নয়..
কবিতার কি ছিড়ি !!
কদিন আগে কোথায় একটা কবিতা পড়ছিলাম "আকাশে উড়েছে চিল , হেসে হেসে পেটে খিল |" যাইহোক পড়তে যখন হবে তখন পড়িয়ে দি | এই তুমি পড়ো |



 *   *   *   *   *   *   *   *   *   *   *   *   *   *   *   *   *   *   *   *  


- কেমন গেল তোমাদের ফার্স্ট মান্থলি পরীক্ষা | কোয়েশ্চেন কেমন হয়েছিল ?
 ক্লাসের সবাই একসাথে বলে উঠলো "কঠিন" |
- কি ??? কঠিন | তোমাদের পরীক্ষার আগে তো কোয়েস্চেন এন্সার লিখিয়ে দিয়েছিলাম | পড়নি নাকি ঠিক করে ! আচ্ছা এবারের পরীক্ষায় কি কবিতা আছে ! আমার দেখা হয়নি | কেউ লিখে এনেছ সিলেবাসটা ?

-- উলঙ্গ রাজা আর দুই বিঘা জমি স্যার |


- কে ঠিক করে বলো তো এই সিলেবাস | দুই বিঘা জমি তবু একটু ঠিক আছে | কিন্তু উলঙ্গ রাজা !!! চিঠি , পথের দিশা, বিভীষণের প্রতি ইন্দ্রজিত এইসব কবিতা ছেড়ে যত জঞ্জাল এনে সিলেবাসে ঢোকায় | আমার তো ইচ্ছা করছে এখনি বলে দিয়ে আসি যে এইসব সিলেবাসে দিলে আমি পড়াতে পারব না | কিন্তু কি আর করা যাবে | নাও পড় |

_________________________________________

Wednesday, August 19, 2015

Narendrapur Bedtime Story - মধ্যরাতে


- ওই, শোন না |

-- হুম !

- ওই !

-- উফ্ জ্বালাস না তো |

খুব বাথরুম পেয়েছে | একা যেতে ভয় লাগছে | আমার সঙ্গে একটু চল না |

-- কি হয়েছে টা কি ! এখানে ভূত বলে কিছু নেই |

- না রে , ভাই আমার তাও কেমন জানি ভয় ভয় করছে | খালি মনে হয় , এই বুঝি পেছন থেকে এসে ধরল বলে !

-- সারাদিন ধরে ভুতের গল্প পড়লে তো ওরকম মনে হবেই | ওই দেখ , কে একটা বাথরুমে গেল | তাড়াতাড়ি করে আয় | ভয় লাগবে না | আমি এখানে জেগে আছি | যা , তাড়াতাড়ি যা |

                           *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  *  * 

-- কিরে , পাঁচ মিনিট ধরে বাথরুম করছিলি নাকি ? কি করছিলি এতক্ষণ ধরে

- ওইতো , তখন বললি না কে একজন গেল | গিয়ে দেখি , সৌরভ | আমাকে দেখে ও আঁতকে উঠেছিল | তারপর বললো ওরও নাকি একা বাথরুম যেতে ভয় করে | তাই আমি একটু সাহস দেখিয়ে ওকে বোঝাচ্ছিলাম যে ভূত-টুত কিসসু হয় না | বরং আমি এতই সাহসী যে আমাকে দেখলে ভূত ভয়ে পালিয়ে যাবে |

-- এত রাত্রে বাথরুমে গিয়ে গল্প করছিলি | তাও আবার ভূত নিয়ে !! নে শুয়ে পড় | এইই , এক মিনিট শোন , কে গেছিল বললি বাথরুমে ?

- সৌরভ রে, আমাদের পাশের পাশের রুমে থাকে |


-- কি ভুলভাল বকছিস !! ও তো দুদিন আগে বাড়ি গেছে ডাক্তার দেখাতে | প্রেসার টা বেশ খানিকটা বেড়ে গেছিল | আমি তো আজকেও সন্ধে অব্দি কই দেখিনি ওকে | ও তো এখনো ফেরেনি হোস্টেলে !!

__________________________________________________