Friday, August 14, 2015

জুনিয়রের তপনদা

রাতে বিরিয়ানি ছিল কিনা মনে নেই...সোয়াবিনের গ্যাদগেদে তরকারি হতে পারে, হতে পারে টিমটিমে সীমের লজঝরে ঘ্যাঁট...ঘটনার কেন্দ্রেও আমি ছিলাম না...হয়ত ছিল আমার খুব কাছের কেউ...ক্লাস সেভেন...ডানা গজাবে কি গজাবে না সেই নিয়ে রোজ টাগ-অফ-ওয়ার...তার মধ্যে ওই সীম চচ্চরির রাতে অভেদানন্দ ভবনের ১৩ নম্বর রুমের ধারের বেডটা ভেসে অযাচিত বমিতে..কোনো আগাম হুংকার ছাড়াই...পাশের ঘরে থাকেন তপনদা...জুনিয়র সেকশনের মাথা...রাত তখন বেশ...১টা বেজে গেছে...কোনোভাবে উঠে পড়েন তপনদা...পাশের রুমে জ্বলছে আলো...এত রাতে কে জ্বালালো??
একলা একটা ছেলে পরিস্কার করছিল ঘর,মেঝে,মশারি...তপনদা তাকে বাইরে বসতে বললেন...তারপর নিজে হাতে শুরু করেন পরিষ্কার...সন্ন্যাসী মানুষ...আবেগ-ভালবাসা-দয়া-দাক্ষিণ্যর ওধারে গিয়ে গেরুয়া ধুতির লোকটা নিজে হাতে ঘর মোছেন...আমরা ঘুমায়...বিকেলে খেলেছি বলে ঘুম আসতেও দেরী হয়নি |
আমাদের সাথে মা ছিল না...স্কুল ড্রেস এ ছিল না নিয়মিত ইস্ত্রি...তারপরেও আমরা স্কুল এ যেতাম...আমাদেরই মধ্যে কেউ অঙ্কে ফুল মার্কস পেত...ন্যাশনাল অলিম্পিয়াড এ ফার্স্ট-সেকেন্ড-থার্ড হত...স্টেডিয়াম এর ওই বিশাল মাঠে মাঝমাঠ থেকে একা বল নিয়ে উঠে গোল দিত...হয়ত ওই ওঠাটাতেই ছিল নিয়ম ভাঙ্গার আনন্দ...বাঁধন ছেঁড়া বিপ্লব...
দুই হপ্তায় একবার আসতো মা...একবার হলো কি স্পোর্টস এর দিনে মা এসছে...আমি সাম রেসের ফাইনাল এ উঠেছি...বিশ্বজয় করেছি...ওদিকে ক্লাস সিক্স এর রিভিসন টেস্টে অঙ্কে করেছি ফেল...একদিকে মাইক এ ডাক -- "সাম রেস ফাইনাল..লাস্ট কল"...অন্যদিকে মায়ের মাথায় বাজ...বলা বাহুল্য ওই ফাইনাল এ পিরুদা এমন অঙ্ক দিয়েছিল যে রেসে লাস্ট হওয়া ছাড়া কোনো "ট্র্যাক" ছিল না...সাম রেসে ফার্স্ট হওয়া ছেলের মা নয়, সেই বিকেলেই "ফেলু" ছেলের মা হিসেবেই মা ঘরে ফেরে...
জ্বর হলে জলপটি , লুজ মোসনে মেট্রোজিল এর আদর হোক, অনাদর হোক...সবটাই ওই চিলেকোঠায়...যেখানে সাথে মা নেই...মায়ের আদর আছে...তপনদা নিজে হাতে ঘর মুছে গৌরদাকে ডাকেন...তারপর ছেলেটাকে নিয়ে ঘুরে আসতে বেরোন...রাত তখন দেড়টা মানে যে কি...সেটা ওই ছেলেটা জানত....জুনিয়র সেকশন এক পাক দেবার পরে তপনদা বিছানা অবধি পৌঁছে দেন ছেলেটাকে...অন্য চাদর...অন্য বালিশ...অন্য মশারি তৈরী থাকে...পরের দিনটা ছেলেটা রুটিন এর গ্যারাকল থেকে মুক্তি পায়...আমাদের তখন হিংসে হয়নি?? আলবাত হয়েছিল...কিন্তু তপনদা রাতের অন্ধকারে হাঁটতে বেরিয়েছিল যখন...তখন কোথায় ছিল আমাদের হিংসে...কোথায় ছিল আমাদের নিয়ম মানা?? তপনদা চিরতার জলকে বলতো মাদ্রাজি চা...বলত "উসুল করে খাও"..
বাবা আর মা একসাথে একভাবে কিভাবে হওয়া যায় তপনদা বুঝতে শিখিয়েছিল...তাই তো দুপুরে চড় খেয়েছি...আর রাতে খেয়েছি মিষ্টি...
আমার দাদা-বন্ধু-ভাইরা আজ ছড়িয়ে যাচ্ছে চারিদিকে..তৈরী করছে দুনিয়াটা...তবু তারা প্রত্যেকেই দিনের শেষে ভালবাসার কাঙ্গাল...এটুকু আমি জানি...সেই ভালোবাসা কে ছকে বাঁধা যায় না..ত্রিগোনোমেট্রির ফর্মুলায় ফেলা যায় না...শুধু ভাবতে ভালো লাগে...সেই স্টাডি হল এ লুকিয়ে গল্পের বই...ভাত কম খেয়ে চানাচুর...আগে স্কুল ছুটির পর রুম ক্রিকেট এ চার...রোববার দুপুরে বাথরুম পার্টি তে "পরান যায় জ্বলিয়া রে"...
ক্লাস ফাইভ এর প্রথম রোববারটায় বন্ধ গেটের এপারে দাঁড়িয়ে যখন চোখের জল আর নাকের জল গুলিয়ে ফেলছিলাম...তখন বিশ্বাস করিনি এই দিনটা একদিন ফুরিয়ে যাবে...বুঝিনি সব চাহিদা পূরণ হওয়ার পরেও জীবনের অনেকটা বাকি থাকে...বুঝিনি ১০ জন একসাথে ফেল করলে সেটা আর নিছক ফেল থাকে না...
এখন সবকটা আঘাত , সবকটা কষ্ট নতুন করে বলে দিয়ে যায়..."আমরা তো অল্পে খুশি, কি হবে দুঃখ করে??..
তপনদা এখন শিলচর এর কোনো এক আশ্রমে ..বেশি খেয়ে ফেলা ছেলেটার বমি পরিষ্কার করছেন বোধহয়...
________________________________________________

শৌণক (মাধ্যমিক ২০১০, উচ্চ মাধ্যমিক ২০১২)

No comments:

Post a Comment

পেটে আসছে মুখে আসছে না ? লিখুন , লিখুন !!