Friday, August 14, 2015

জুনিয়রের তপনদা ২

পোস্টকার্ড, ইন্ল্যান্ড লেটারে চিঠিপত্রের যুগ আর নেই ! বাংলা পরীক্ষাতে প্রবন্ধ আসবে না চিঠি -- সেটাই এখন একমাত্র চিন্তা | ১১ বছর আগে যখন ছেলেদের একঘরে আর বাবা-মায়েদের আর এক ঘরে বসিয়ে হোস্টেলের নিয়ম কানুন বোঝানো হচ্ছে তখন প্রথম বলা হত "এখানে ছেলের সাথে যোগাযোগের একমাত্র উপায় চিঠি, টেলিফোন এ যোগাযোগ করা যাবে না |" ১১ বছর পরে সেই একই আলাপচারিতার শেষে "চিঠি"র কথাটা মনে করিয়ে দিতে হয় | ডাইনিং হল থেকে চিঠি পড়তে পড়তে রুমে ফিরে গোনা শুরু হত এ সপ্তাহে কার কটা চিঠি এলো | হপ্তায় অন্তত দুটো বাবার দুটো মায়ের চিঠি, কারোর একটাই চিঠি বাবার কিংবা মায়ের |
সেকশনে রোল নম্বর ১০ হওয়াই ক্লাস সিক্সে উঠে অভেদানন্দ ভবনে যেতে হবে না জেনে যতটা আনন্দ হয়েছিল, ক্লাস সেভেনে উঠে অভেদানন্দ ভবনে গিয়ে ততটাই আক্ষেপ হয়েছিল | "পিঠে খেলে পেতে সয়" -- এ কথাটা জুনিয়র সেকশনে থাকতে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গিয়েছিল | সে ভালবাসাটুকু বেশি করে পেতে মার খাওয়াটা জরুরি ছিল না, কিন্তু আনন্দ ছিল | ভিসিটিং ডে তে মাংস ফ্রাইড রাইস পেটে না পড়লে ডিনারের পর ১৩ নম্বর রুমের সামনে মিষ্টির ভুরিভোজ বরাদ্দ ছিল | ফাও থাকত নরেন্দ্রপুরের ভূতেদের গল্প | কিংবা ফোনে একটু কথা বলার সুযোগ | বাবা মা না আসার দুঃখ বিন্দুমাত্র টের পেতে দিতেন না |
১৭ বছর একই জায়গায় একই ভাবে থাকতে থাকতে যখন একটু হাওয়া বদলের দরকার হলো , ক্লাসের অঙ্কে ৪০ এ ২০ পেয়েও যখন একটা ছেলে আরেকটা নম্বরের আশায় কেঁদে চলেছে আর ফেল করেও যে ছেলের চোখে এক ফোঁটা জল আসেনি সেও সেদিন কেঁদে ফেলল, যে ছেলেটা প্রতিদিন ক্লাসে গোলমাল করে প্রতিদিন বাইরে কান ধরে নীল ডাউন থাকে, সেও সেদিন একেবারে শান্ত | ২ মাসের জন্য কেন, সারা জীবনের জন্য তপনদা কে পেলেও মন ভরবে না | গ্লাসে "high protein" বিলিয়ে দেওয়ার কেউ থাকবে না এরপর থেকে | উদয়্দার কাছে অকারণে মার খেলে সে নালিশ শোনার কেউ থাকবে না | ১৩ নম্বর রুমে আর কাউকে ভাবতে পারাটা বেশ কঠিন ব্যাপার |
কোথাকার হাওয়াই ভালো লাগছে না | তাই নরেন্দ্রপুর থেকে বেলুর মঠ-ঝাড়গ্রাম-বেনারস হয়ে শেষে শিলচর | সেখানের হাওয়াও হয়ত আর মনে ধরছে না | তাই এখন কৃত্রিম জীবনযাপন | ICU তে ভর্তি হয়ে তিনি হয়ত আর চিঠির জবাব গুলো দিতে পারবেন না | সেদিন ছাড়া কোনদিন না কাঁদা সেই ছেলেটার চিঠি | শেষ ক মাসে আর লেখা হয়ে ওঠেনি | ভালবাসা যে শুধুমাত্র চিঠির মাধ্যমেও অকাতরে বিলিয়ে দেওয়া যায়, তা তিনি ভালই রপ্ত করেছেন | জন্মদিনের সকালে সাড়ে সাতটায় প্রতি বছরে নিয়মিত ফোন "শুভ জন্মদিন, খুউব ভালো থেকো , বাবা মা কে দেখো ,আর পারলে যারা গরিব আছে তাদের জন্য কিছু কোরো" | বাবা মায়ের আশির্বাদ তো বরাদ্দ, কিন্তু ইনার টা না পেলে জন্মদিনের পায়েসেও জন্মদিন হবে কি ! শেষ চিঠিটা লেখা হয়ে ওঠেনি পুরোটা, কলেজের মোটা বইয়ের মাঝে এখনো অর্ধেক লেখা হয়ে গোঁজা আছে |
 _________________________________________

No comments:

Post a Comment

পেটে আসছে মুখে আসছে না ? লিখুন , লিখুন !!