Friday, August 14, 2015

কয়েদী নম্বর, সিলিং ফ্যান এবং ‘সচিন বনাম সৌরভ’ ঝগড়া

প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দেশে বিদেশে’ তে আফগানিস্তানের এক দুর্ভাগা কারাবন্দীর কথা লিখেছেন | গল্পটি এরকম - একবার কিছু কয়েদিকে এক জেল থেকে অন্য জেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, এমন সময় এক কয়েদি পালিয়ে যায়, এরপর কারারক্ষীরা হিসাব মেলানোর জন্য রাস্তা থেকেই একটা গোবেচারা লোককে উঠিয়ে নিয়ে জেলে পুরে নিজেদের চাকরি বাঁচায় | জেলে পৌঁছানোর পর বেচারা নিরীহ লোকটি আত্মপক্ষ সমর্থনে কিছু নিশ্চয়ই বলবার চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু কেউই সেটা পাত্তা দেয়নি | এরপর বহুকাল জেলখানার দুর্বিসহ অন্ধকার কুঠরিতে বাস করে এই হতভাগা লোকটি তার নিজের নাম, পরিচয়, পারিবারিক স্মৃতি সব ভুলে যায়, শুধুমাত্র একটি সত্তা তার মধ্যে অবশিষ্ট থাকে, সেটা হল সে ‘কয়েদি নম্বর পয়তাল্লিশ’! বড় মর্মান্তিক কাহিনী !
উপরের ঘটনাটার সাথে আমাদের বন্দিজীবনের পার্থক্যটা হল নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন নামক জেলখানায় আমাদের জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়নি, সেখানে আমরা স্বেচ্ছায় রীতিমতো অ্যাডমিশন টেস্ট দিয়ে বন্দিদশা বেছে নিয়েছিলাম | মিলটা হল ওই সম্পূর্ণ সত্তা জুড়ে কয়েদী নম্বরটা থাকার ব্যাপারটা | নরেন্দ্রপুরের জেলখানায় প্রতিটি আবাসিককে একটা করে কয়েদি নম্বর দেওয়া হয় যার পোশাকি নাম ‘রেজিস্ট্রেশন নাম্বার’ | মিশন থেকে পাশ করে বেরিয়েছি ১১ বছর হয়ে গেল, ওখানকার ছোট-বড় অনেক ঘটনাই স্মৃতি থেকে মুছে গেছে, কিন্তু ওখানকার কয়েদী নম্বরটা ভুলে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না | ফলে এখন ই-মেল, অনলাইন ট্রানসাকশান ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রেই পাসওয়ার্ডের অংশ হিসাবে আমি ওই নম্বরটা উল্টেপাল্টে ব্যবহার করি | মিশনে পড়াকালীন নাম, ঠিকানা, বংশমর্যাদা – এই সমস্ত কিছুর উর্দ্ধে ওই কয়েদী নম্বরটাই ছিল আমাদের পরিচয় | আমার মা ওই নম্বরটা আমার জামা-প্যান্ট-বিছানার চাদর-গেঞ্জি-জাঙ্গিয়া-মোজা-গামছায় সুতো দিয়ে সেলাই করে লিখে দিতেন | অন্যদিকে বাক্স-প্যাঁটরা, ট্রাঙ্ক, স্কুল ব্যাগ, জলের বোতল, পেন্সিল বক্স, জিওমেট্রি বক্স, খেলার ব্যাট ইত্যাদিতে এবং জুতো ও কেডসের ভিতরের দিকে নম্বরটা লেখা হত পার্মানেন্ট মার্কার দিয়ে | সব ছাত্রের অভিভাবকরাই এভাবে তাঁদের সন্তানকে ‘দাগী’ আসামী বানাতেন | এতোসবের উদ্দেশ্য একটাই – একজনের জিনিস যাতে অন্যের সাথে তালেগোলে মিশে হারিয়ে না যায় | আরেকটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার, অন্যান্য স্কুলের মতো আমাদের রোল নম্বর অ্যানুয়াল পরীক্ষার পজিশন অনুযায়ী নির্ধারিত হতো না, বরং আমাদের স্কুলে রোল নম্বর নির্ধারিত হতো এই কয়েদী নম্বর অনুযায়ী | যার কয়েদী নম্বর সামনের দিকে, তার রোল নম্বরও হবে সামনের দিকে | মিশন থেকে আমাদের যে থালা-গ্লাস দেওয়া হতো তাতেও ওই কয়েদী নম্বরটা খোদাই করে দেওয়া থাকতো | ওই থালাটা এখনো আমার কাছে আছে, জেলখানার স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে |
||||
আমি যখন নরেন্দ্রপুরে ভর্তি হই, সেটা ১৯৯৬ সাল, তখন হস্টেলের ঘরে কোনো ফ্যানের বন্দোবস্ত ছিল না | প্রথমদিন হস্টেলের ঘরে ঢুকে ব্যাপারটা লক্ষ্য করে আমার মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়েছিল | মা-বাবা ব্যাপারটা আগে থেকেই জানতেন, কিন্তু ওনারা আমাকে ব্যাপারটা বলেননি | প্রথম এক-দুই রাত তো প্রায় ঘুমই হয়নি | তারপর থেকে ব্যাপারটা ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে যায় | সারাদিনে তো কোনো সমস্যা ছিল না, কারণ স্কুলের ক্লাস রুমে, ডাইনিং হলে, স্টাডি হলে, প্রেয়ার হলে ইত্যাদি সব জায়গাতেই ফ্যান ছিল | রাতে বিছানায় শোওয়ার পর খানিকক্ষণ তালপাতার হাতপাখা দিয়ে নিজেকে হাওয়া করতাম, তারপর আপনা থেকেই ঘুম চলে আসতো | আসলে সারাদিন গায়ের তেল নিংড়ানো Daily schedule-এর চক্করে পড়ে আমরা এমন দৌড়-ঝাঁপের মধ্যে থাকতাম যে রাতের বেলা lights off-এর পর আমাদের পক্ষে ওই হা-ক্লান্ত শরীরে ১৫ মিনিটের বেশি জেগে থাকাই মুশকিল হতো | ফলে সেসময় ফ্যান না থাকলেও ঘুমাতে অসুবিধা হতো না | তবে মুশকিল হতো ছুটির দিনে দুপুর বেলা, গরমকালে ওই সময়টায় বেশ কষ্ট হতো | তখন গামছা, রুমাল ইত্যাদি ভিজিয়ে মুখে-গায়ে জড়াতাম | এরকম ভাবেই কেটেছিল আমাদের ক্লাস ফাইভ, সিক্স আর সেভেনের প্রথমদিকের কয়েকটা মাস |
অবশেষে আসে সুদিন | ১৯৯৮-৯৯ – এই সময়টা নরেন্দ্রপুর মিশনের ইতিহাসে রেনেশাঁর মতো, যখন বহির্জগতের আধুনিকতার ঢেউ মিশনের রক্ষনশীলতার বালুতটে আছড়ে পড়ছে | এমন সময়েই হস্টেলের ঘরে ঘরে সিলিং ফ্যানের আবির্ভাব, আমরা তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি | কোনো এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা মিশনকে ফ্যানগুলো ডোনেট করে | আবির্ভাবের প্রথমদিকে বেশ কিছু দিন এই ফ্যান ছিল নববধুর মতো লজ্জাশীলা, দিনের অন্যান্য সময়ে সে থাকত অন্তরালে, শুধু রাতের বেলা খাওয়াদাওয়ার পরে করত সে রূপপ্রকাশ, আবার সকাল হতে না হতেই হয়ে পড়ত অবগুন্ঠিতা | আসলে ফ্যানের মেইন সুইচ থাকত হোস্টেল সুপারিটেন্ডেন্ট মহারাজদের দখলে, অত্যন্ত কৃপণের মতো তাঁরা সেটির ব্যবহার করতেন | মাঝেমাঝে রাত শেষ হবার আগেই ফ্যান বন্ধ করে দিতেন | শীতকাল কবে বিদায় নিয়েছে, সোয়েটার-মাফলার আমরা বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি, ক্লাসরুম-স্টাডি হল-ডাইনিং হল ইত্যাদি সব জায়গায় ফ্যান চালানো শুরু হয়ে গেছে, তাসত্ত্বেও রাতে শোওয়ার সময় রুমে ফ্যান চালানো হতো না, কারণ মহারাজদের হিসাবে ‘গরম’ নাকি তখনো পড়েনি | যাইহোক, বছর খানেক পরে নিয়মে সামান্য পরিবর্তন আসে, ততদিনে আমরা সিনিয়র সেকশনে চলে এসেছি, তখন থেকে রোববার, বৃহঃস্পতিবার (ঐদিন আমাদের ছিল হাফ-ডে) আর অন্যান্য ছুটির দিনে দুপুরে খাওয়ার পর থেকে বিকালের প্লে-টাইম অব্দি ফ্যান চালানো হত | আর পাঁচ-দশ মিনিটের জন্য প্রতিদিন সকালে P.T. থেকে আসার পর ফ্যানটা চালানো হতো |
২০০২ সালে মাধ্যমিক পাশ করার পর ইলেভেনে ভর্তি হয়ে আমরা আসি নরেন্দ্রপুর কলেজের হস্টেলে (সেসময় HS সেকশন নরেন্দ্রপুর কলেজের অন্তর্গত ছিল) | আমি ছিলাম ব্রহ্মানন্দ ভবনে, সেখানে ফ্যানের ওপর কোনো বিধিনিষেধ ছিল না | ফলে বাঁধা গরু ছাড়া পেলে যা হয়, আমাদেরও সেই দশা হলো | ইলেভেন-টুয়েলভে পড়াকালীন আমাদের ঘরে প্রায় চব্বিশ ঘন্টাই ফ্যান চলতো | স্নান-খাওয়া করে ক্লাস করতে কলেজ যেতাম ঘরের ফ্যানটা চালিয়ে রেখেই, নিজেরাই নিজেদেরকে যুক্তি দিতাম যে এতে নাকি ঘরটা ঠান্ডা থাকবে !! কি মারাত্মক সম্পদের অপচয়, এখন বুঝতে পারি, সেসময় কিন্তু বিন্দুমাত্র অনুশোচনা হতো না |
||||
স্কুলে পড়াকালীন আমাদের তর্কের একটা জনপ্রিয় বিষয় ছিল ‘সচিন না সৌরভ- কে সেরা ?’ আমাদের স্কুলজীবনের সময়কাল ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৪ সাল অব্দি, যেটা কিনা সচিন-সৌরভের স্বর্ণযুগ | ফলতঃ আজকাল যেরকম ‘মেসি বড় ফুটবলার নাকি রোনাল্ডো’ গোছের একটা তর্ক সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে লেগেই থাকে, আমাদের সময়েও ওই ক্রিকেটীয় তর্কটা আমাদের মধ্যে চলতেই থাকতো | অনেক ঝগড়াঝাটি, হাতাহাতি হয়েছে এই ইস্যু নিয়ে | একবার তো ক্লাস চলাকালীন কোনো এক স্যারের সামনে প্রসঙ্গটা ওঠে এবং খানিক পরেই সচিনপ্রেমী উত্তেজিত এক বন্ধু অন্য আরেক বন্ধুকে স্যারের সামনেই এক থাপ্পড় কষিয়ে দেয় | আমাদের সময়ে ইংলিশ মিডিয়ামে বেশ কিছু ছেলে পড়তো যাদের বাড়ি ছিল বিহারে, এরা ছিল হিন্দিভাষী | এরা ছিল মারাত্মক সচিন প্রেমী ও সৌরভ-বিদ্বেষী | এরা যখন কারণে-অকারণে সৌরভের নিন্দা করতে শুরু করত তখন আমরা বাকিরা (ইংলিশ ও বেঙ্গলি মিডিয়াম নির্বিশেষে তখন আমাদের বাঙালী সত্তাটাই প্রবল হয়ে উঠতো) চোখ বুঁজে সৌরভের পক্ষ সমর্থন করে তর্ক শুরু করতাম এবং বেশিরভাগ সময়েই সেটা ক্রিকেটের সীমানা ছাড়িয়ে বাঙালী বনাম বিহারী (তথা ‘হিন্দুস্তানী’) মার্কা ঝগড়ায় পরিণত হতো | রাগের চোটে অনেক বন্ধুকেই বলতে শুনেছি যে বাঙালি তথা কোলকাতার তো এতগুলো নোবেল আছে, একটা অস্কারও আছে, কিন্তু ওই খোট্টা বিহারিগুলোর কি আছে ??
________________________________________________
©
অর্ঘ্য দাস (মাধ্যমিক-২০০২, উঃ মাঃ-২০০৪)
দুর্গানগর, ২৫-০৫-২০১৫


No comments:

Post a Comment

পেটে আসছে মুখে আসছে না ? লিখুন , লিখুন !!