Friday, August 14, 2015

২৫শে বৈশাখ

নাহ, আজ আর শ্যামাসঙ্গীত গাওয়া হয়নি | বাঁধা ধরা নিয়মের মত সকালের স্টাডি হল নেই | আর হবেই বা কেন ? সমস্ত বাংলা যখন একজনকে নিয়ে মেতে উঠেছে তখন আমরাই বা বাদ পড়ি কেন !! সকাল থেকেই সাজো সাজো রব | যাদের স্টেজ পারফরমেন্স আছে তাদের নতুন মার দেওয়া ধুতি , তাই কোঁচাটা আর একজনকে ধরে ঠিক করে দিতে হচ্ছে | কারো পাঞ্জাবীতে আবার রবীন্দ্রনাথের রৈখিক মুখাবয়ব , কারো লেখা আছে, “চিরনূতনের দিল ডাক ২৫শে বৈশাখ” | রঙিন পাঞ্জাবী পরা চলবে না , চপ্পল পরা চলবে না , কিটো পরে লাইন দিয়ে যেতে হবে | লাইনের সবার আগে থাকবে সমিত্দা, আশিসদা, আর শেষে শ্রীকেশদা, বিজয়দাদের সজাগ দৃষ্টি | ভবন জয়ন্তীর মত পূজা পাঠ নেই , ভবন সাজানোর সে আড়ম্বরও নেই | আজ রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছানুসারে ছেলেরা “অচলায়তন” ছেড়ে আম্রকুঞ্জে একত্রিত হবে |
পাওরুটি কফি খেয়ে গুটি গুটি পায়ে চলা শুরু | যখন জুনিয়র সেকশনই এ দুনিয়ার সবচেয়ে বড় গন্ডি তখন “আম্রকুঞ্জও” এক বড় আদরের তাত্ক্ষণিক স্বাধীনতা | সে পথে যেতে যেতেই গোঁফু বাহাদুরদার স্নিগ্ধ হাসি , রোজকার শোনা ভুতের গল্পের বাঁশবাগান এর পাশ দিয়ে হাঁটার সময় অপর্যাপ্ত আলোচনা সেখানের ভূতগুলো ভালো না মন্দ , সরস্বতী ভাসানের বাঁধানো পুকুর ঘাট , পারলে টেলরিং এর দিকে একবার উঁকি মেরে দেখা নতুন জার্সি এলো কিনা , নাগলিঙ্গমের ফুল পাড়িয়ে – এইসব দেখতে দেখতেই সেখানে পৌছানো | ১৫ই আগস্ট এর মত বাইরে তারস্বরে মাইকের আওয়াজ নেই | শান্ত-সুস্থ পরিবেশ | যারা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবে তাদের কোলে ইয়া বড় বড় হারমোনিয়ামের গিটারের ভার থাকলেও লাইনের পাশ দিয়ে রিক্সা করে সেলিব্রিটির মত বেড়িয়ে যাওয়াটাতে যে কি অপরিসীম আনন্দ, তা তাদের প্রধানমন্ত্রীর মত হাত নাড়তে নাড়তে বেরিয়ে যাওয়া দেখলেই বোঝা যায় | 
ধুপ-ধুনো-মালার গন্ধে চারিদিক ম-ম করছে | “ছায়াবিথিতলে” ছোট্ট স্টেজ | গাছতলায় বসার জায়গাগুলোতে বাবা-মায়ের আকুল চোখ | খাবারের টিফিনবক্স সঙ্গে থাকুক না থাকুক, ক্যামেরাগুলো ঠিক সঙ্গে আছে | স্টেজে উঠে আজ এটাই এখানে ওর প্রথম পারফরমেন্স, যেখানে সবাই শ্রোতা ও দর্শক, রবীন্দ্রনাথও | আজ বি.বি.এ-র দাদারা নয় , আমাদের ছোট ছোট হাতেই সুর উঠবে গিটারে, সিন্থেসাইজারে, বাঁশিতে, মাউথ অর্গানে – “পুরানো সেই দিনের কথা..” এই একটা গানেই মেতে উঠবে সমস্ত আম্রকুঞ্জ | গানে, কবিতায় সবাই মুগ্ধ হবে | ছেলের মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠবেন রবীন্দ্রনাথ | আজকের দিনে কবি-পরিচিতি মুখস্তের প্রয়োজন নেই, কবিতার মর্মার্থ বোঝার দরকার নেই , আজকে শুধু তাঁর সুরে সুর মেলানো হবে |
যথাসময়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো | কবিপ্রণাম এর কোনো ত্রুটি হওয়ার সম্ভাবনা নেই | কবিতাপাঠ, গান-বাজনা, বক্তৃতা সবই হলো | কিন্তু তাঁকে কি আর এত অল্প সময়ে বর্ণনা করা যায় !! যিনি জীবনের প্রতিটি মুহুর্তে আমাদের মনের সাথে একাত্ব হতে পারেন তাঁকে শুধু স্মরণই করতে পারি আমরা | অনুষ্ঠান পর্ব শেষ হলো | সকলে একে একে নিজের ভবনের পথে পা বাড়ালো | অভিভাবকরাও ছেলেদের মধ্যে দিয়েই রবীন্দ্রনাথ দর্শন করে বাড়ি মুখে রওনা দিলেন | আমাদের রবীন্দ্রনাথ কে পাওয়া আর তাঁদের ছেলেকে কিছুক্ষণের জন্য চোখের দেখা দেখতে আসা প্রায় একরকম বললেই চলে | এত অল্প সময়ে দুটো ব্যাপারেই তৃপ্তিতে অপূর্ণতা থেকেই যায় |
যখন জানতাম না রবীন্দ্রনাথ খায় না মাথায় মাখে, তখন অজান্তে মজ্জায় ঢুকে গেছিল – “জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে, বন্ধু হে আমার রয়েছ দাঁড়ায়ে..”-এর সার্থকতাটা রবীন্দ্রনাথের না আমার মননের তার বিচার আর করি না, করব না |

 _________________________________________

No comments:

Post a Comment

পেটে আসছে মুখে আসছে না ? লিখুন , লিখুন !!