Sunday, August 16, 2015

রেডিও

পরীক্ষামুখের বিষণ্ণ সেল্ফ স্টাডিতে ঘরে-বাইরে-ব্লকে-বাথরুমে বই হাতে পায়চারি,এপাশ ওপাশ,হাতে বই নিয়েও চোখ ইতি উতি খোঁজে না পড়া বন্ধুটাকে। বিষণ্ণতার কর্পূর যায় উবে..তারপর আদি অনন্তকালের কতকথা । রাত বাড়ে, আলো নেভার সময় আসে-আর মনের বনে বাঁশি বাজিয়ে ঘরে ঘরে জ্বলে ওঠে এক চিলতে আলো ।

রেডিও- আমার,আমাদের হোস্টেলজীবনের অবিসংবাদিত সাহসের দলিল। যে দলিলে সাজানো থাকে সচিনের ২০০, হুল্লোড়ের দিওয়াঙ্গি,আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।

আমাকে আমার মতো থাকতে দেবে কারা? যারা রাতের পর রাত জেগে আমার প্র্যাক্টিকালের আরশোলা এঁকে দিল তারা? নাকি যারা স্কুলফিরতি আমায় ঝরাজলের ট্যাঙ্কের তলায় দাঁড় করিয়ে দেয় তারা?? আমার শ্যাম্পু আমার একার নয় । আমার রেডিও তো আরওই নয়। ছুটি থেকে ফিরে প্রথম রাতে নতুন রেডিও উদ্বোধন,মাথাভরা ভয় আর বুকভরা প্রাপ্তি সরু তার বেয়ে দুদিক থেকে কানে এসে ঢোকে..দুঃসাহসিক মাঝরাতে স্পিকারওয়ালা রেডিওতে তার আর গোঁজা হয় না,ভলিউম কমানোর নিখুঁত শিল্পে সবাই কমবেশী হই পারদর্শী ।জানলা খোলা ঘরের আলো আঁধারিতে রাত দুটোয় হঠাৎ যদি বেজে ওঠে Rock On,মনে হয় আমি চাই না সুখ-মুক্তি-স্বস্তির তফাৎ।

মুক্তি কাকে বলে? সন্ধে নামলে বাড়ি না ফিরে যা ইচ্ছে তাই করা-কে?? আর নিয়মখাঁচার লোহার ফাঁক দিয়ে ঠুকরে ঠুকরে আকাশটাকে নামিয়ে আনার চেষ্টা তবে কী??

আর স্বস্তি? 

ঐ যে ঐ মুহূর্তটা-প্রচন্ড গরমের রোববার সকালে খেলাশেষে কলেজের blue star এ অমৃতপান....

ভবনের হর্তাকর্তাদের আগে আমরা খবর পাই স্কোরের ।সৌজন্যে-সেই আমাদের ছোট্ট মিষ্টি রেডিও।

ভাগ্যে থাকলে খেয়ে ফিরেই কমনরুমের সামনের বেঞ্চে রাশি রাশি ভেজা থালা,চটির স্তূপ পেরিয়ে খানিকক্ষণের খেলাদরশন....

রেডিও অন করাটা যদি শিল্প হয় তবে তা লুকিয়ে রাখাটা শিল্পতর। বালিশের মাঝে,তোশকের তলায়,ধুতির খুঁটে-তারপরেও অযাচিত ওয়ারেন্টে খোয়া যায় এর-ওরটা। কাউকে বলা যাবে না,জানা যাবে না কখন নিয়ে নিল-শুধু কপাল চাপড়াতে হবে পরের রেডিও জোগাড় না হওয়া পর্যন্ত।
হপ্তাশেষের রাতে কাঁটা গায়ে দল বেঁধে Sunday suspense...কখনও শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়া-ঘুম ভেঙেই ব্যাটারি শেষের হাহাকার। রেডিও হয়ে উঠল একটা অমোঘ মায়া,বিনোদন আবার সর্বাত্মক অবলম্বন। আগলঘেরা দিনে রেডিও আমাদের আলগা সুতোর ডানা....মধ্যরাতের মজলিশ,শান্তির alpenlibe...যন্ত্রের সর্বস্বতা পেরিয়ে যার আনাগোনা-হাত বদল,অলিখিত চুক্তি সাথে- যার কাছে ধরা পড়া,দায় তার ।

একা ঘরে এখন রাতে রেডিও খুব কম চলে। চললেও রেডিওর পক্ষে over-smart ফোনগুলোয়..ছোট্ট জিনিসটা আর পাওয়া যায় কিনা সে খোঁজও নেওয়া হয় না । বিধি-বহির্ভূত যন্তরে মহালয়ার মন্তরটাও আর সে আবেগ ঢেলে দেয় না..কিন্তু ফিরে তাকানো হয় সেই স্বপ্নালু রাতগুলোর দিকে-ভোর হতেই আবার পি.টি,আবার ঘুমচোখে স্টাডি হল,খিদে পেটে ভাজা ভাতের চোখরাঙানি-কিন্তু এই যে বাকি রাতটুকু..রেডিওভরা রাতটুকুর আঁটি ছাড়া যাবে না....

আজ,এক্ষুনি আমি যখন চাইলেই আমার কানে পছন্দের গান গুঁজতে পারি তখন সারদানন্দ ভবনের ১১ নম্বর রুমের মাঝের বেডের ছেলেটা friends থেকে red,mirchi থেকে power এ ঢুঁ মারছে বারবার..sooraj dooba hai টা যে কখন দেবে.....
________________________________________________

No comments:

Post a Comment

পেটে আসছে মুখে আসছে না ? লিখুন , লিখুন !!