Friday, August 14, 2015

মুড়ি-মাহাত্ম্য

মুড়ি-মাহাত্ম্য
নরেন্দ্রপুর মিশনে থাকতে মুড়ি ছিল আমাদের জাতীয় খাদ্য | আমরা প্রথম দিনেই বিকালের টিফিন হিসাবে পেয়েছিলাম রসগোল্লা-মুড়ি, সঙ্গে একগ্লাস দুধ | কম্বিনেশনটা আমার কাছে একদম অপরিচিত ছিল, ফলে খেতে গিয়ে প্রাণান্তকর অবস্থা হয়েছিল | পরে অবশ্য অভ্যাস হয়ে গেছিল | মিশনে সপ্তাহে প্রায় প্রতিদিনই বিকালের টিফিনে মুড়ি দেওয়া হত, কোনদিন সঙ্গে থাকত চালের পায়েস, কোনদিন বা সুজির পায়েস, কোনদিন চপ বা সিঙ্গাড়া আবার কোনদিন দেওয়া হত চানাচুর-পেয়াঁজ-লঙ্কা-ছোলা-সিদ্ধ আলুর কিউব সহযোগে মশলামুড়ি | আমাদের ব্যাচে বেশ কিছু মেদিনীপুর নিবাসী ছেলে ছিল, ভুরি ভুরি মুড়ি খেতে এদের জুড়ি ছিল না | ওদের মুড়ি খাওয়া দেখে আমাদের তাক লেগে যেত মাঝেমাঝে |
ক্লাস নাইন আর টেনে পড়াকালীন আমরা কয়েকজন ডাইনিং হল থেকে গ্লাসে বা পকেটে ভরে মুড়ি চুরি করে রুমে নিয়ে আসতাম | রাতে খাওয়াদাওয়ার পর সেল্ফ-স্টাডি টাইমে মহা উৎসাহে ‘মশলামুড়ি উৎসব’ পালন করা হত | আমি তখন যোগানন্দ ভবনে থাকি, ২০০০-২০০২ সাল, হোস্টেল সুপার ছিলেন নাড়ু (নারায়ণ) মহারাজ | মহারাজ রোজ রাতে দশটা নাগাদ একবার রাউন্ড দিতে আসতেন, সেই ব্যাপারটাকে মাথায় রেখে রীতিমতো পালা করে একজনকে গার্ডে বসিয়ে রুমের মধ্যে মুড়ি মাখা হত | প্রায় নয়-দশ গ্লাস ভর্তি মুড়ি হত, সঙ্গে থাকত মা-বাবার দিয়ে যাওয়া চানাচুর, মেইন কিচেন বা ভবনের ডাইনিং হল থেকে চেয়েচিন্তে আনা পেয়াঁজ-লঙ্কা-শসা আর গায়ে মাখার সর্ষের তেল | ইম্প্রোভাইজেশনের জন্য কখনো কখনো মিশিয়ে দেওয়া হত ভাস্কর লবন, বা হজমি-চূর্ণ কিম্বা আচার | মুড়ি মাখার পাত্রের অভাব থাকায় স্নানের বালতিতেই মুড়ি মাখা হত | মশলামুড়ি মেখে বেশ নাম করে নিয়েছিলাম আমি সেই সময় | এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি, যোগানন্দ ভবনের পাশেই একটা বাতাবি লেবু গাছ ছিল | সেই লেবু পেড়ে নুন-লঙ্কা-চিনি সহযোগে বাতাবি লেবুমাখাও খেয়েছি অগুনতি দিন | আর গরমকালে কালবৈশাখীর পরেরদিন আমমাখা তো ছিলই | সবকিছুই হত ওই রাতের সেলফ-স্টাডি টাইমে |
ওই সময়েই, মানে ক্লাস নাইন-টেনে পড়াকালীনই যেদিন বিকালে খেলতে যাওয়ার আগে স্ন্যাকস (লাইট টিফিন) হিসাবে ফুচকা দেওয়া হত, সেদিন আমরা কয়েকজন খেলা থেকে ফিরে এসে টিফিনের (হেভি টিফিন) বেল পড়ার আগেই ডাইনিং হলে গিয়ে হাজির হতাম | আসলে প্রতিদিনই কিছুটা ফুচকার আলুমাখা উদ্বৃত্ত থাকত, সেটা দিয়ে মুড়ি মেখে খেতে বড় ভালো লাগত | কিন্তু জিনিসটা খুব বেশি পরিমানে থাকত না, মানে প্রথম মাত্র নয়-দশ জনই সেটা পেত, সেজন্যই আগেভাগে দৌড়ে ডাইনিং হল যাওয়া |
ক্লাস ইলেভেনে ওঠার পর আমরা নরেন্দ্রপুর কলেজে ভর্তি হলাম, কারণ আমাদের সময়ে H.S. সেকশন কলেজের অন্তর্ভুক্ত ছিল | সেসময় সপ্তাহে একদিন ডিনারে আলুরদম দেওয়া হত | আমরা কয়েকজন খাওয়াশেষে আরো কিছুটা আলুরদম একটা গ্লাসে করে নিয়ে আসতাম | গভীর রাতে যখন খুব খিদে পেত, তখন ওই আলুরদমটা মুড়ি সহযোগে খেতাম | সেই স্বাদও ভোলার নয় |
মাধ্যমিক পরীক্ষার পর আমরা জনা বিশেক মিশনের বন্ধু মা-বাবা সমেত দীঘা বেড়াতে গিয়েছিলাম দু’ দিনের জন্য | প্রায় জনা পঞ্চাশেক লোক, ফলে আমরা একটা গোটা বাস ভাড়া করে নিয়ে গেছিলাম | সঙ্গে ছিল রান্নার লোক, গ্যাস-ওভেন সহ রান্নার যাবতীয় সরঞ্জাম | হোটেলের খাবার খেতে অনেকেরই আপত্তি থাকায় এই ব্যবস্থা | বাড়ি ফেরার পথে একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল | ভোরবেলা শুধু চা-বিস্কুট খেয়ে আমরা দিঘা থেকে রওনা দিয়েছি, ঘন্টা দুয়েক পরে গাড়ি থামানো হবে ব্রেকফাস্ট করার জন্য | ব্রেকফাস্টের জন্য সঙ্গে নেওয়া হয়েহে মুড়ি, চানাচুর আর চাট মশলা | আগেরদিন রাতে চিলি চিকেন অনেকটা বেঁচে গেছিল, সেটাকে না ফেলে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, প্ল্যান ছিল যে রাস্তায় ভিখারীদের দিয়ে দেওয়া হবে | যাইহোক, ঘন্টা দুয়েক পরে একটা রেস্ট হাউসের পাশে গাড়ি থামিয়ে ভিতরে ঢুকে মুড়ি মাখা হল | কিন্তু সকাল সকাল শুকনো মুড়ি চিবাতে কার আর ভালো লাগে ! সবাই কিরকম একটা মুখ ব্যাজার করে খেতে লাগলো | হঠাৎ একজন বলে উঠলো, “আচ্ছা, কালকের চিলি চিকেনটা বের করো তো, ওটা দিয়ে মুড়ি খেয়ে দেখি |” কয়েকজন হেসে উঠলো, ভাবটা এমন যে ওটা দিয়ে কি আর মুড়ি খাওয়া যায় !! যাইহোক, আস্তে আস্তে একজন দুজন করে বেশ কয়েকজন নিয়ে ফেলল চিলি চিকেন | তাদের তৃপ্তি ভরে মুখ চালাতে দেখে বাকিরা যেন নড়েচড়ে বসলো | এরপর কয়েক মিনিটে যা হল তাকে হরির-লুঠ বলাই চলে | কোথায় কোন ভিখারী, আমরা সবাই চেছেপুছে সব নিয়ে নিলাম | চিলি চিকেন দিয়ে মুড়ি যেন অমৃততুল্য বলে মনে হয়েছিল সেদিন |
এরকম করেই আমাদের সাথে মুড়ি বা মুড়ির সাথে আমরা অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে পড়েছিলাম মিশনে পড়াকালীন | মিশন ছাড়ার পর অনেকেই আমরা এই মুড়ি-প্রেম ত্যাগ করতে পারিনি | বরং এই অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিস দিয়ে মুড়ি খাওয়ার রোগটা সংক্রামিত করে দিয়েছি আরো অনেকের মধ্যে | যেমন যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন যখন মেসে থাকতাম তখন অনেকদিন দুপুরের বেঁচে যাওয়া শুকনো তরকারী দিয়ে বিকালে মুড়ি মেখে খেয়েছি সবাই | প্রথমদিন আমাকে তরকারী দিয়ে মুড়ি মাখতে দেখে বাকিরা হেসেছিল, কিন্তু একবার ওই স্বাদ আস্বাদন করার পর ওরাও মোহিত হয়ে গেছিল | এরপর থেকে ওই মুড়িমাখা খাওয়ার জন্য মেসে কাড়াকাড়ি পড়ে যেত |
এখনো বাড়িতে আমি মাঝেমাঝেই সয়াবিনের তরকারী কিম্বা বাঁধাকপির তরকারী দিয়ে মুড়ি মেখে খাই | কিম্বা দু’ পিস মাংস আর এক পিস আলু সহ মাংসের ঝোল দিয়ে | আমার এই অদ্ভুত খাওয়ার কাহিনী আমার আত্মীয়স্বজনদের একটা মজাদার আলোচ্য বিষয় | কিন্তু আমি এতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হই না | লোকের কোথায় কান দিলে চলে না | পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলছি, নিজের বাড়িতে এরকম উদ্ভট খাবার ট্রাই করতে সংকোচ বোধ হচ্ছে ? কুছ পরোয়া নেহি, আসুন না একদিন আমার বাড়িতে, আমার সাথে বসে চেখে দেখবেন | Open invitation রইলো |
________________________________________________

©
অর্ঘ্য দাস (M.E. 2002, H.S. 2004)


No comments:

Post a Comment

পেটে আসছে মুখে আসছে না ? লিখুন , লিখুন !!