ক্লাস এইটের প্রথমদিন (১৯৯৯ সাল), নরেন্দ্রপুরের সিনিয়র সেকশনের স্কুলে সেদিনই আমাদের
প্রথম ক্লাস করা | এর
আগে তিনবছর আমরা ছিলাম জুনিয়র সেকশনে | গোলঘর, ব্যাডমিন্টন কোর্ট, দোলনা, প্লেগ্রাউন্ড স্লাইড, পাখির
খাঁচা, হরিণের খাঁচা- এসব নিয়ে ওটা ছিল একটা কিন্ডারগার্টেন
গোছের জায়গা | ওখানে থাকতেই শুনতাম
সিনিয়র সেকশন খুব বড় জায়গা, হস্টেলে
নিয়মের খুব কড়াকড়ি, পড়াশুনার
খুব চাপ, পান থেকে চুন খসলেই টি.সি. দেওয়া হয় ইত্যাদি ইত্যাদি | অজানা নতুন জায়গায় এলে এমনিতেই একটা অস্বস্তিবোধ হয়, তার উপর আবার এসব কথা মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, সব মিলিয়ে প্রথম দিনে আমাদের অবস্থা যথেষ্ট নড়বড়ে | যাইহোক, অ্যাসেম্বলি-এর
পর সবে ক্লাসে এসে বসেছি, হঠাৎ
দেখি ঝড়ের বেগে , প্রায়
দৌড়েই, সাদা ধূতি পাঞ্জাবী পরা কে একটা ক্লাসে এসে ঢুকলো ।
ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে প্রায় লাফিয়ে টিচার-টেবিলটার উপর ডান-পা টা মুড়ে তুলে
দিয়ে বকের মতো এক পায়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। কিছুই বুঝতে পারার আগেই জলদগম্ভীর স্বরে আওয়াজ
এলো "আমার নাম অজিত সেনগুপ্ত , আমি
জীবন-বিজ্ঞান পড়াই"। কি আপদ !! সিনিয়র স্কুলের সবকটা স্যারই এরকম স্যাম্পেল
পিস্ নাকি !
তখন জানতাম না, আজ
জানি, অজিত সেনগুপ্ত একটি unique piece
- একমেবাদ্বিতীয়ম !! সারা দুনিয়া খুঁজলেও এরকম আরেকটি পাওয়া যাবে না |
রোলকল শুরু হলো। আমরা ইয়েস স্যার , প্রেজেন্ট স্যার করে চলেছি, ওদিকে আমাদের বন্ধু, গোবেচারা
ভালোমানুষ অর্ক মৈত্র আপন মনে নিজের ডট পেন টা নিয়ে খট-খট আওয়াজ করে খেলে চলেছে ।
হঠাৎ করে আবার দৈববাণী হলো "অর্ক, আমার
ক্লাসে রোলকলের সময় কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এর দরকার হয় না"। অর্ক বেচারার
মুখটা দেখে বেলুন চুপসে যাওয়ার দৃশ্যটা মনে ভেসে উঠলো । এরপর লম্বা নিয়মের
ফিরিস্তি। ওনার ভাষাতেই বলি " আমার ক্লাসে আমি আসার আগে কেউ টয়লেট যাবে না, আমি আসার পর আমার অনুমতি নিয়ে অবশ্য যেতে পারো " , "আমি আসার পর ক্লাসের দরজা বন্ধ
হয়ে যাবে, কারণ আমি আমার ছাত্রকে চুমু খাবো নাকি লাথি মারবো, সেটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার, সেটা বাইরে থেকে অন্য কেউ দেখুক এটা আমি চাই না", "আমি ক্লাসে পড়ানোর সময় চেয়ার
টানার, বাগের চেন খোলার-ইত্যাদি কোনোরকমের আওয়াজ করা চলবে
না" ইত্যাদি ইত্যাদি.... । ভয়ের চোটে আমাদের আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড় | ভাবছি কি উজবুকের পাল্লাতেই না পড়া গেলো !!!! যাইহোক
পুরো ক্লাস টা কোনমতে কাটালাম । স্যার চলে যাওয়ার পর আমরা সেদিন মুহ্যমান হয়ে বসে
ছিলাম ।
এরপর শুধু একটা কথাই বলা যথেষ্ট হবে যে মাত্র একমাস
যাওয়ার পরেই আমাদের অবস্হা এমন হলো যে যেদিন অজিতদার ক্লাস থাকত না সেদিন আমাদের
স্কুল-এ আসতে ভালো লাগত না । ভদ্রলোক বোধহয় ম্যাজিক জানতেন !
অজিতদা বলতেন যে দুটো বদনাম নাকি ওনাকে একদম দেওয়া যায়
না- প্রথম টা হলো "অজিতদা পড়ান " আর দ্বিতীয়ত টা হলো "অজিতদা
ঠিকঠাক সময়ে পরীক্ষার খাতা চেক করে ফেলেন".!!! সত্যি, উনি পড়াতেন না, গল্প
বলতেন, subject-টা visualize করাতেন । জীবনবিজ্ঞান ক্লাস ওটা
মোটেও ছিল না, ওটা ছিল মনের জানালা
খুলে দেওয়ার ক্লাস।অজিতদার অসাধারণ পান্ডিত্য, অদ্ভুত
বাচনভঙ্গি আর অসামান্য রসবোধ - এই তিনে মিলে প্রতিটা ক্লাস হওয়া উঠত অনবদ্য । আমি
সেই গুটিকয়েক সৌভাগ্যবানদের একজন যারা অজিতদার ক্লাস স্কুললাইফে দু’বার পেয়েছে | মনে আছে, ক্লাস
টেনে ওঠার পর রুটিনে যখন জীবনবিজ্ঞানের পাশে অজিতদার নাম দেখেছিলাম, তখন আমরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেছিলাম | ভদ্রলোকের মুন্সিয়ানা ছিল পড়ানোর বিষয়কে বাস্তবমুখী করে
তোলাতে | জীবনবিজ্ঞানের প্রায় প্রতিটা টপিকের সাথে অজিতদা একটা
করে গল্প জুড়তেন, মাঝে
মাঝে রবীন্দ্রনাথের এক একটি কবিতার লাইন | জাস্ট
অসাধারণ !!
আর দ্বিতীয় বদনাম টা একদম সত্যি ছিল আর এরজন্য আমরা
যথেষ্ট বিরক্ত হতাম।সমস্ত খাতা বেরিয়ে গেছে, কত
পার্সেন্ট মার্কস আসবে সেইনিয়ে চিন্তায় মারা যাচ্ছি, ওদিকে
অজিতদার খাতা দেখানোর কোনো নামগন্ধ নেই। এরই মধ্যে একদিন খালি হাতে এলেন, আমরা যারপরনাই হতাশ, হঠাৎ
করে পাঞ্জাবির পকেট থেকে খাতার বান্ডিল বার করলেন !! খাতার চেকিং ও সেরকম, মানে নম্বর দিতেন ভালই, কিন্তু
কমেন্টগুলো পড়ে অনেকেরই উত্পটাং হবার জোগাড় হতো । আমাদের এক বন্ধু, এখন অস্ট্রিয়া থাকে, তার
হাতেরলেখা ভালো ছিলনা ।ওর খাতায় অজিতদা লিখেছিলেন যে ওটার থেকে নাকি সার্বজনীন
শৌচালয় বেশি পরিষ্কার থাকে। আমাদের আরেক বন্ধু, একাধারে
কবি আর পুলিশ, সে খুব যত্ন করে plant cell-এর ছবি একেছিল, অজিতদা ওটাকে "আলপনা" বলে অভিহিত করেছিলেন ।
আরেক বন্ধু, বর্তমানে ডাক্তার, পরীক্ষার খাতায় অপাঠ্য হস্তাক্ষরে লিখেছিল | তা দেখে অজিতদা ওটাকে ‘ডাক্তারোচিত হাতেরলেখা’ বলে
অভিহিত করেছিলেন |
জীবনের প্রথম যৌনশিক্ষা পেয়েছিলাম অজিতদার কাছ থেকেই | ক্লাস এইটে কুনো ব্যাঙের জননতন্ত্র পড়ানোর সাথে সাথে
অজিতদা মানুষের জননতন্ত্রটাও পড়িয়ে দিতেন, যদিও
ওটা মোটেই সিলেবাসে ছিল না | অজিতদা
বলতেন ভুলভাল সচিত্র চটিবই বা বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে জানার থেকে কোনো জীবন
বিজ্ঞান শিক্ষকের কাছ থেকে ব্যাপারগুলো জেনে নেওয়া অনেক ভালো | রীতিমতো ছবি এঁকে ব্যাখা করেছিলেন সবকিছু | Menstruation নিয়ে উনি বলেছিলেন, “ ধর, কোনো
এক মহিলার স্বামী বিদেশে থাকেন | বহুদিন
পর স্বামী আসছেন, সকাল
থেকেই ভদ্রমহিলা খুব খুশি | সারাদিন
ধরে ভীষণ যত্ন নিয়ে নানারকমের পদ রান্না করেছেন, পুরো
বাড়িটাকে সাজিয়েছেন | এরপর
বিকাল নাগাদ হঠাৎ প্রতিক্ষমানা স্ত্রীর কাছে স্বামীর ফোন এল যে ফ্লাইট ক্যানসেল
হয়ে গেছে, ফলে তিনি আসতে পারবেন না | রাগে, ক্ষোভে, হতাশায়
ভদ্রমহিলা সমস্ত খাবার টান মেরে ফেলে দিলেন, সুদৃশ্য
কাঁচের পাত্রগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল |... ঠিক
এরকমই জরায়ুমধ্যস্থ ডিম্বানু আঠাশ দিন ধরে প্রতিক্ষা করে থাকে শুক্রানুর জন্য, এরপর যখন সে সত্যিই আসে না তখন ডিম্বানু হতাশায়
চারিদিকের দেয়াল বিদীর্ণ করে ফেলে, সে
থেকেই রক্তক্ষরণ হয় !”
মন্দির গেটের নীলাচল কমপ্লেক্সে নিজস্ব ফ্ল্যাট থাকলেও
সপ্তাহে এক-দু দিন সারদানন্দ ভবনের পেছনদিকে লাগোয়া একটা ছোট্ট ঘরে থাকতেন | অনেকদিন সেখানে দল বেঁধে গিয়েছি অজিতদার সাথে গল্প করার
জন্য | কত স্মৃতি সেসব গল্পের | অজিতদা
বলতেন, তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ রবীন্দ্রনাথ | এছাড়াও তাঁর বড় পছন্দের চরিত্র ছিল অ্যাডলফ হিটলার | নিজের বিয়ে না করা নিয়ে অজিতদা জানিয়েছিলেন যে
উত্তরাধিকারসুত্রে মাত্র দুটো জিনিস তিনি পিতার কাছ থেকে পেয়েছেন – একটি হীরের
আংটি এবং তাঁর হাঁপানি রোগ | এই
রোগটি অপর আরেকজনকে দিয়ে যেতে চান না, তাই
বিয়ে করেন নি | পড়ানো, চাল চলন, ব্যক্তিত্ব
থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবন – সবকিছুতেই একটা ছকভাঙা ব্যাপার ছিল লোকটার মধ্যে | মিশন থেকে পাশ করার পর যতবার স্কুলে গিয়েছি, ততবারই সবার আগে খোঁজ করেছি অজিতদার | যেদিন চলে গেলেন, আমি
তখন যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে পড়ি , খবর
পেয়েই ছুটে গিয়েছিলাম শেষ দেখা দেখতে | আজও
সেই দিনটার কথা মাঝেমাঝে মনে পড়ে | তারপর
কতদিন স্বপ্ন দেখেছি গিলে করা পাঞ্জাবী পরে, সিগারেট
আর পারফিউমের গন্ধে মাখামাখি হয়ে, বকের
মতো হাঁটু মুড়ে দাঁড়িয়ে, মুখ
থেকে থুতুর ফোয়ারা ছুটিয়ে অজিতদা ক্লাসে পড়িয়ে চলেছেন আর মাঝেমাঝে কোদালের মতো
বত্রিশ পাটি বের করে রসিকতা করছেন |
যাইহোক, অজিতদার
সম্বন্ধে লিখতে গেলে একটা গোটা বই হয়ে যাবে । তাই আজ আর কথা বাড়াচ্ছি না । পরে
নাহয় আরেকদিন অজিতদাকে নিয়ে কথা হবে | শুধু
একটুকুই বলি, অজিতদা আজও আমাদের
মধ্যে ভীষণ ভাবে বেঁচে আছেন | আজও
‘শিক্ষক’ শব্দটা শুনলে আমাদের মনে ওনার নামটাই সবার আগে ভেসে ওঠে |
পুনশ্চ: লেখাটার সাথে অজিতদার কয়েকটা ফটোও দিলাম |
_______________________________________________
© অর্ঘ্য দাস (মাধ্যমিক ২০০২, উচ্চ মাধ্যমিক ২০০৪) & টুকটাক লেখালেখি
প্রথম লেখা : গোয়ালিয়র , ৫-৯-২০১৪
পরিমার্জন : দুর্গানগর , ৯-৪-২০১৫
© অর্ঘ্য দাস (মাধ্যমিক ২০০২, উচ্চ মাধ্যমিক ২০০৪) & টুকটাক লেখালেখি
প্রথম লেখা : গোয়ালিয়র , ৫-৯-২০১৪
পরিমার্জন : দুর্গানগর , ৯-৪-২০১৫

No comments:
Post a Comment
পেটে আসছে মুখে আসছে না ? লিখুন , লিখুন !!