Friday, August 14, 2015

স্বপ্নের সে দিন - গোপালদা

গোপালদা - আমাদের ডাইনিং হল এর সার্ভার...প্রেমানন্দ ভবনে ১১-১২ দুই বছর ছুটে বেড়ানো লোকটাকে দেখেছি ঘেমে নেয়ে নিজের কাজটা করে যেতে...একা গোপালদা নয়...আগের বছরগুলোই গোপালদার জায়গায় ছিলেন বাবুদা, নিমাইদা, ঠাকুরদা, কালিদা আরো কত কে...কিন্তু কিভাবে যেন গোপালদা আমাদের সবচেয়ে বেশি নাড়িয়ে দিয়ে যায়...তার পিছনে "রাজনৈতিক" কারণ যা-ই থাক...ভালোবাসাটা মিথ্যে ছিল না...ঠিক হলো বেরিয়ে আসার আগে সবাই মিলে গোপালদা কে কিছু একটা দেওয়া হবে...সাধ হলো, সাধ্য মাপা হলো...এলো টাইটান সোনাটা ঘড়ি আর গোপালদার সদ্য বিয়ে হয়েছে জেনে আমাদের "না-দেখা" বৌদির জন্য একটা শাড়ি...ওই শেষ দিনগুলোর এক রাতে গোপালদা সব সেরে ভবন থেকে বেরোচ্ছে -- সবাই মিলে পিছু ডাকলাম... গোপালদা ভয় পায়...এতগুলো ১২-এর ছেলে এক ঘরে ডাকছে...বাওয়াল নয় তো??! তবু আসে গুটি গুটি পায়ে....
বেশ ভদ্র ভাষায় কিছু বলে গোপালদার হাতে তুলে দিই সোনাটা-শাড়ি...
গোপালদা জানে না ওই প্যাকেট এ কী, জানে না শাড়িটার রঙ...হঠাৎ আমাদের জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে শুরু করলো...নিষ্পাপ,উচ্ছল কান্না...যে কান্না আজও বুকের এক কোণে চুপটি করে বসে থাকে...আমাদের রোজকার মন ভাঙ্গার কান্না, ফোন ভাঙ্গার কান্না, ব্যর্থ প্রেমের অব্যর্থ মুহূর্তযাপনের কান্না কে থাপ্পর মারতে মারতে সে রাতে প্রতিটা ফোঁটা গড়িয়ে পড়েছিল...অনেক চেষ্টা করে গোপালদা কথা বলার...কিন্তু যা-ই শুরু করে, স-ব ভিজে একাকার হয়ে যায়...শেষমেষ আমাদের কাদা মাখা জার্সি, অসহ্য গন্ধের গামছা, নোংরা ভরা ঘরটা কে চুপ করিয়ে দিয়ে গোপালদা ঘর ছাড়ে...সাইকেল বের করে,ঘড়ি-শাড়ি ঝোলায়...
আমরা চুপ..কথা আসে না মুখে...কি বলি...কি করি...শুধু চোখ মেলে তাকাই...অন্ধকার নিঝুম রাস্তায় সাইকেলটা ঝাপসা হয়ে যাওয়ার আগে অবধি দেখতে পাই গোপালদা অনবরত মুছেও চোখের কোণা দুটো শুকোতে পারছে না...
কেন ভেঙ্গে পড়ল সেদিন গোপালদা?? বিশাল ডেকচির ভিতর পরোটা থাকুক কি বিরিয়ানি, যার খাটনির বহর বদলায় না, আগুনের আঁচে যার বাইরেটা বারবার ছারখার হয়ে যায়, তার কি হলো হঠাৎ??
দিনে দিনে বুঝেছি ওটাকে ভেঙ্গে পড়া বলে না...নতুন করে বেঁচে ওঠা বলে...নিংড়ে চলা পথের শেষে ঠান্ডা জলে শান্তি-স্নান বলে...ডালের বালতিটা যে এত যত্নে ঢেকে নিয়ে আসে রোজ, সে নিজেকে ঢাকতে পারেনি...পারেনি বলেই বোধহয় সে রাতটা গোপালদার সাইকেল তাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়...পিছনে বসে থাকে আমাদের এদিক-ওদিক ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার গোপালদা...সে রাতে গোপালদা আমাদের ঘরে ঢুকেছিল একা, বেরিয়েছিল "অনেক" হয়ে...
আমরা হিসেব করি শুধু...নম্বর এর হিসেব, কত ঘন্টা পড়লাম তার হিসেব, চেয়ে না পাওয়ার হিসেব, পুরনো জিন্স-জামা-জুতোর হিসেব...হিসেব সত্যি দরকার, দায়িত্ব বাড়লে ওটাও সাথে সাথে বাড়ে...কিন্তু সেই অঙ্ক কষা দুনিয়ায় অনুভূতির-ও হিসেব কষতে শিখে গেলে হয় বিপদ...চার ফোঁটার বেশি জল পড়লে মনে হয় -- "ইসস, আমাকে দেখতে খুব বাজে লাগছে না তো???"
না, "সোনালী সোনাটা" আছে বলে গোপালদা পরদিন ভোর থেকে "সোনালী চুলের নায়ক" হয়ে যায়নি...খুন্তি নাড়া বন্ধ হয়নি...ভাত ফুরোলে পাশের ভবনে ছুটে যাবার স্পিড কমেনি...
গোপালদার "কান্না"-র ছবি তোলা হয়নি কোনো...ভাগ্যিস !! তাই আজ রাত বিরেতেও গোপালদা আমাদের ঘরে এসে ঢোকে...আজ আর ভয় নেই, সংকোচ নেই...
শেষ পাতে জমিয়ে রাখা ডিম-মাখা আছে..
.
থালার কানায় ঝোলের দাগ আছে.
.
আছে এক আকাশ রোদ্দুর...আর আছে সোনাটা ঘড়ির টিক-টিক..
বিনা নোটিশে পৌঁছে গোপালদা'র সাথে আচমকা দেখা হয়ে গেলে আজ চোখ চলে যায় গোপালদার হাতের দিকে... ঐ টিক্ টিক্ শুনতে পাই যেন..
বন্ধ হয়ে গিয়ে থাকলেও বা কি যায় আসে ???!!
________________________________________________
শৌণক [মাধ্যমিক'২০১০, উচ্চ মাধ্যমিক'২০১২]


No comments:

Post a Comment

পেটে আসছে মুখে আসছে না ? লিখুন , লিখুন !!